supermom-logo
Go to Home
পূর্ববর্তী গর্ভাবস্থার ইতিহাস এবং পরবর্তী গর্ভাবস্থায় এর প্রভাব

পূর্ববর্তী গর্ভাবস্থার ইতিহাস এবং পরবর্তী গর্ভাবস্থায় এর প্রভাব

একজন নারীর আগের গর্ভাবস্থার ফলাফল কেমন ছিল, তা পরবর্তী গর্ভাবস্থার যত্ন, পর্যবেক্ষণ এবং ঝুঁকি মূল্যায়নের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। চিকিৎসার ইতিহাস বা 'অবস্টেট্রিক হিস্ট্রি' থেকে মায়ের শারীরিক অবস্থা, গর্ভফুলের (Placenta) কার্যকারিতা, জেনেটিক ঝুঁকি এবং গর্ভাবস্থার সাথে শরীরের খাপ খাইয়ে নেওয়ার ক্ষমতা সম্পর্কে অপরিহার্য ধারণা পাওয়া যায়। গবেষণায় দেখা গেছে যে—আগে গর্ভপাত, অকাল প্রসব, সিজারিয়ান ডেলিভারি, গর্ভকালীন ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপজনিত সমস্যা বা মৃত সন্তান প্রসবের মতো ঘটনাগুলো পরবর্তী গর্ভাবস্থার ঝুঁকির মাত্রাকে প্রভাবিত করতে পারে [১][২]।

আগের গর্ভাবস্থার ফলাফলগুলো যত্ন সহকারে পর্যালোচনা করলে চিকিৎসকরা পরিবর্তনযোগ্য ঝুঁকিগুলো শনাক্ত করতে পারেন, গর্ভধারণের আগের স্বাস্থ্য পরিস্থিতি উন্নত করতে পারেন এবং বিশেষ পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেন। সঠিক সময়ে কাউন্সিলিং বা পরামর্শ এবং বিজ্ঞানসম্মত পদক্ষেপ গ্রহণ করলে মা ও নবজাতক উভয়েরই সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করা সম্ভব হয় [৩]।

পূর্ববর্তী গর্ভাবস্থার প্রভাব

আগের গর্ভাবস্থার ফলাফলগুলোকে সাধারণত নিচের বিভাগগুলোতে ভাগ করা যায়:

গর্ভাবস্থার শুরুতে গর্ভপাত: গর্ভাবস্থার প্রথম দিকে গর্ভস্থ সন্তান নষ্ট হয়ে যাওয়া।

জরায়ুর বাইরে গর্ভধারণ (Ectopic Pregnancy): যখন ভ্রূণ জরায়ুর ভেতরে না বেড়ে বাইরে (যেমন ডিম্বনালীতে) বড় হতে থাকে।

অকাল প্রসব: সময়ের আগেই (৩৭ সপ্তাহ পূর্ণ হওয়ার আগে) শিশুর জন্ম হওয়া।

জন্মের সময় শিশুর কম ওজন: নবজাতকের ওজন স্বাভাবিকের চেয়ে কম থাকা।

গর্ভাবস্থায় উচ্চ রক্তচাপজনিত সমস্যা: গর্ভাবস্থায় উচ্চ রক্তচাপ বা প্রিক্ল্যাম্পসিয়া দেখা দেওয়া।

গর্ভকালীন ডায়াবেটিস: গর্ভাবস্থায় প্রথমবারের মতো রক্তে শর্করার মাত্রা বেড়ে যাওয়া। 

সিজারিয়ান ডেলিভারি: অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে শিশুর জন্ম।

মৃত সন্তান প্রসব: গর্ভাবস্থার ২০ সপ্তাহ পরে বা প্রসবের সময় মৃত শিশু জন্ম নেওয়া।

এই ফলাফলগুলোর প্রতিটিই মায়ের শারীরিক অবস্থা, গর্ভফুলের (Placenta) কার্যকারিতা, বিপাকীয় স্বাস্থ্য বা জরায়ুর অভ্যন্তরীণ অবস্থা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ক্লিনিক্যাল সংকেত প্রদান করে [৪]।

পূর্ববর্তী গর্ভপাত 

গর্ভপাত বলতে গর্ভাবস্থার ২০ সপ্তাহ পূর্ণ হওয়ার আগেই গর্ভস্থ সন্তান নষ্ট হয়ে যাওয়াকে বোঝায় [৩]। আগে গর্ভপাতের ইতিহাস থাকলে পরবর্তী গর্ভাবস্থার জন্য বিশেষ সতর্কতা ও সহায়ক পরামর্শের প্রয়োজন হয়। সম্ভাব্য ঝুঁকির কারণগুলো আগেভাগে শনাক্ত করতে পারলে পরবর্তী গর্ভাবস্থায় সফল হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়।

পুনরাবৃত্তির ঝুঁকি: একবার গর্ভপাত হয়েছে এমন অধিকাংশ নারীই পরবর্তী সময়ে সুস্থ সন্তানের জন্ম দেন। তবে, যদি কারো একাধিকবার (টানা দুই বা তার বেশি বার) গর্ভপাত হয়, তবে তার জেনেটিক, শারীরিক গঠনগত, হরমোনজনিত বা অটোইমিউন কোনো সমস্যা আছে কি না তা পরীক্ষা করা প্রয়োজন [৩][৫]।

April 02 A.png 

সঠিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা গ্রহণ করলে পরবর্তী গর্ভাবস্থায় ঝুঁকি অনেকাংশে কমানো সম্ভব [৫]।

পূর্ববর্তী অকাল প্রসব 

পূর্ববর্তী অকাল প্রসব বা 'প্রি-টার্ম বার্থ' বলতে বোঝায় গত কোনো গর্ভাবস্থায় ৩৭ সপ্তাহ পূর্ণ হওয়ার আগেই শিশুর জন্ম হওয়া [১][৬]। অকাল প্রসবকে সাধারণত দুই ভাগে ভাগ করা যায়: 

স্বতঃস্ফূর্ত অকাল প্রসব: যা প্রসব বেদনা শুরু হওয়া বা সময়ের আগে পানির থলি ফেটে যাওয়ার কারণে ঘটে। 

চিকিৎসাজনিত অকাল প্রসব: যখন মা বা শিশুর কোনো গুরুতর শারীরিক সমস্যার কারণে চিকিৎসকরা নির্ধারিত সময়ের আগেই প্রসব করাতে বাধ্য হন।

আগে অকাল প্রসবের ইতিহাস থাকা পরবর্তী গর্ভাবস্থায় আবারও সময়ের আগে প্রসব হওয়ার অন্যতম প্রধান ঝুঁকি হিসেবে বিবেচিত হয়। আগের প্রসবটি কত সপ্তাহে হয়েছিল এবং এর পেছনে মূল কারণ কী ছিল, তার ওপর ভিত্তি করে পুনরায় একই ঘটনার পুনরাবৃত্তির ঝুঁকি কম-বেশি হতে পারে।

যাদের পূর্বে অকাল প্রসবের ইতিহাস রয়েছে, তাদের পরবর্তী গর্ভাবস্থায় বিশেষ যত্নের প্রয়োজন হয়। যেমন:

প্রসবপূর্ব যত্ন: গর্ভাবস্থার শুরু থেকেই নিয়মিত চেক-আপ নিশ্চিত করা।

জরায়ুর মুখ বা সারভিক্সের দৈর্ঘ্য পর্যবেক্ষণ: জরায়ুর মুখ সময়ের আগে খুলে যাচ্ছে কি না তা আল্ট্রাসনোগ্রামের মাধ্যমে নিয়মিত পরীক্ষা করা।

প্রজেস্টেরন থেরাপির বিবেচনা: চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী হরমোন থেরাপি গ্রহণ করা (প্রয়োজন সাপেক্ষে)।

এই ধরনের প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করলে পুনরায় অকাল প্রসবের ঝুঁকি অনেক কমে যায় এবং নবজাতকের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা বৃদ্ধি পায় [৬]।

পূর্ববর্তী উচ্চ রক্তচাপজনিত জটিলতা

গর্ভাবস্থায় উচ্চ রক্তচাপ বা প্রিক্ল্যাম্পসিয়া-র ইতিহাস থাকলে পরবর্তী গর্ভাবস্থায় এই সমস্যাগুলো পুনরায় হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেড়ে যায় [২]। যাদের আগে প্রিক্ল্যাম্পসিয়া হয়েছিল, তাদের ক্ষেত্রে নিচের ঝুঁকিগুলো বেশি থাকে:

পুনরায় প্রিক্ল্যাম্পসিয়া হওয়া: পরবর্তী গর্ভাবস্থায় আবার রক্তচাপ বেড়ে যাওয়ার উচ্চ সম্ভাবনা।

গর্ভফুলের অপর্যাপ্ততা: গর্ভফুল বা প্লাসেন্টা সঠিকভাবে কাজ না করা, যার ফলে শিশু পর্যাপ্ত পুষ্টি পায় না।

শিশুর শারীরিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হওয়া: জরায়ুর ভেতরে শিশুর বৃদ্ধি স্বাভাবিকের চেয়ে ধীর হওয়া।

গর্ভাবস্থার শুরু থেকেই নিয়মিত রক্তচাপ পরীক্ষা এবং মেটাবলিক স্ক্রিনিং বা শারীরিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে এ ধরনের জটিলতাগুলো অনেক কমিয়ে আনা সম্ভব [৩][৭]।

পূর্ববর্তী গর্ভকালীন ডায়াবেটিস (GDM)

গর্ভকালীন ডায়াবেটিস বা জিডিএম (GDM) থাকলে পরবর্তী গর্ভাবস্থায় এই সমস্যাটি পুনরায় হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি থাকে। একইসাথে এটি ভবিষ্যতে টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার দীর্ঘমেয়াদী ঝুঁকিও বাড়িয়ে দেয় [২][৮]। যাদের আগে গর্ভকালীন ডায়াবেটিস ছিল, তাদের জন্য করণীয়:

রক্তে শর্করার পরীক্ষা: গর্ভধারণের আগে অথবা গর্ভাবস্থার একদম শুরুর দিকে গ্লুকোজ স্ক্রিনিং বা রক্তে শর্করার মাত্রা পরীক্ষা করে নেওয়া।

সঠিক ওজন বজায় রাখা: উচ্চতা অনুযায়ী শরীরের আদর্শ ওজন নিশ্চিত করা।

পরিকল্পিত জীবনযাপন: একটি সুষম খাবার তালিকা মেনে চলা এবং নিয়মিত ব্যায়াম করা।

সঠিক সময়ে স্ক্রিনিং বা পরীক্ষা করা মা এবং নবজাতক, উভয়ের শারীরিক জটিলতা কমাতে সাহায্য করে [৮]।

পূর্ববর্তী সিজারিয়ান ডেলিভারি

আগে সিজারিয়ান বা অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সন্তান প্রসবের ইতিহাস থাকলে, পরবর্তী গর্ভাবস্থায় সন্তান প্রসবের পদ্ধতি কেমন হবে—তা নির্ধারণে এটি বড় প্রভাব ফেলে। নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে সিজারের পর নরমাল ডেলিবারি বা 'VBAC' (Vaginal Birth After Cesarean) নিরাপদ হতে পারে। তবে এটি মূলত কয়েকটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করে:

জরায়ুর কাটা বা ক্ষতের ধরন: আগের সিজারের সময় জরায়ুর কোন অংশে এবং কীভাবে কাটা হয়েছিল।

আগের সিজারের সংখ্যা: ইতিপূর্বে কতবার সিজারিয়ান অপারেশন করা হয়েছে।

অন্যান্য প্রসূতিজনিত জটিলতা: বর্তমানে গর্ভাবস্থায় মা বা শিশুর কোনো বিশেষ ঝুঁকি আছে কি না [৩]।

জরায়ু ফেটে যাওয়া বা অন্যান্য মারাত্মক জটিলতা এড়াতে প্রসবের আগে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে ঝুঁকি মূল্যায়ন করা অপরিহার্য।

পূর্ববর্তী মৃত সন্তান প্রসব 

যাদের আগে মৃত সন্তান প্রসব বা 'স্টিলবার্থ'-এর ইতিহাস রয়েছে, তাদের পরবর্তী গর্ভাবস্থায় অনেক বেশি নিবিড় পর্যবেক্ষণের প্রয়োজন হয়। এর পেছনের কারণ খুঁজে বের করতে এবং পরবর্তী ঝুঁকি কমাতে নিচের পরীক্ষাগুলো করা হতে পারে:

গর্ভফুল বা প্লাসেন্টা পরীক্ষা: গর্ভফুলের কার্যকারিতা এবং কোনো অস্বাভাবিকতা ছিল কি না তা যাচাই করা।

থ্রম্বোফিলিয়া পরীক্ষা: রক্ত জমাট বাঁধা সংক্রান্ত কোনো সমস্যা আছে কি না তা দেখা।

ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ পরীক্ষা: এই দুটি সমস্যা স্টিলবার্থের বড় কারণ হতে পারে, তাই নিয়মিত স্ক্রিনিং জরুরি।

জেনেটিক মূল্যায়ন: প্রয়োজনবোধে বাবা-মায়ের জিনগত কোনো ত্রুটি আছে কি না তা পরীক্ষা করা।

শারীরিক পরীক্ষার পাশাপাশি এই সময়ে মানসিক সহায়তা সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আগের এমন তিক্ত অভিজ্ঞতার ফলে পরবর্তী গর্ভাবস্থায় মা ও পরিবারের সদস্যদের মধ্যে তীব্র দুশ্চিন্তা ও আবেগীয় চাপ দেখা দিতে পারে [৯]।

শিশুর কম ওজন বা ধীর শারীরিক বৃদ্ধি

আগের গর্ভাবস্থায় যদি শিশুর ওজন স্বাভাবিকের চেয়ে কম হয় অথবা গর্ভকালীন বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হয়ে থাকে, তবে তা গর্ভফুলের অকার্যকারিতা, মায়ের উচ্চ রক্তচাপ অথবা মেটাবলিক কোনো সমস্যার সংকেত হতে পারে [৪]। তাই পরবর্তী গর্ভাবস্থায় নিচের বিষয়গুলো নিশ্চিত করা প্রয়োজন:

বৃদ্ধি পর্যবেক্ষণ: আল্ট্রাসনোগ্রামের মাধ্যমে গর্ভস্থ শিশুর ওজন ও বৃদ্ধি নিয়মিত পরীক্ষা করা।

ডপলার স্টাডি: প্রয়োজনবোধে গর্ভফুলের মাধ্যমে শিশুর রক্ত সঞ্চালন ঠিক আছে কি না তা বিশেষ পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত করা।

পুষ্টির উন্নয়ন: গর্ভবতী মায়ের সুষম ও পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করা।

সম্ভাব্য ঝুঁকিগুলো শুরুতে শনাক্ত করা গেলে নবজাতকের সুস্থতা ও সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করা সহজ হয়।

পুনরাবৃত্তির ঝুঁকি বৃদ্ধিতে সহায়ক সাধারণ কারণসমূহ 

পূর্ববর্তী গর্ভাবস্থার জটিলতাগুলো পরবর্তী সময়ে আবারও ফিরে আসবে কি না, তা কয়েকটি পরিবর্তনযোগ্য বিষয়ের ওপর নির্ভর করে:

মায়ের বয়স: বয়স বাড়ার সাথে সাথে কিছু প্রজনন ঝুঁকি বৃদ্ধি পেতে পারে।

বডি মাস ইনডেক্স (BMI): উচ্চতা অনুযায়ী সঠিক ওজন বজায় রাখা গর্ভাবস্থায় অত্যন্ত জরুরি।

দীর্ঘমেয়াদী রোগ: ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপের মতো সমস্যাগুলো নিয়ন্ত্রণে রাখা।

ধূমপান বা নেশাজাতীয় দ্রব্যের ব্যবহার: এগুলো সরাসরি মা ও শিশুর স্বাস্থ্যের ক্ষতি করে।

দুই গর্ভাবস্থার মধ্যবর্তী সময়: একটি সন্তান জন্মের পর পরবর্তী গর্ভধারণের আগে শরীরকে পর্যাপ্ত সময় দেওয়া।

গবেষণায় দেখা গেছে যে, পর্যাপ্ত বিরতি (দুই গর্ভাবস্থার মাঝে অন্তত ১৮ মাস) বজায় রাখলে মা এবং নবজাতক উভয়েরই সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করা সহজ হয় [১][২]।

April 02 B_.png 

আবেগীয় এবং মানসিক দিকসমূহ

পূর্ববর্তী গর্ভাবস্থায় কোনো জটিলতার অভিজ্ঞতা থাকলে, পরবর্তী গর্ভাবস্থায় তা মা ও পরিবারের মধ্যে তীব্র দুশ্চিন্তা, ভয় বা মানসিক কষ্টের কারণ হতে পারে। বিশেষ করে যাদের আগে গর্ভপাত বা মৃত সন্তান প্রসবের ইতিহাস রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে বিষণ্নতা এবং দুশ্চিন্তার লক্ষণগুলো গুরুত্বের সাথে পরীক্ষা করা উচিত [৯]। গর্ভাবস্থায় মায়ের মানসিক সুস্থতা কেবল তার নিজের জন্য নয়, বরং প্রসবপূর্ব স্বাস্থ্যকর আচরণ এবং গর্ভাবস্থার ভালো ফলাফলের ওপরও ইতিবাচক প্রভাব ফেলে [১০]।

গর্ভধারণের আগে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ 

পূর্ববর্তী গর্ভাবস্থায় কোনো প্রতিকূল বা জটিল পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়ে থাকলে, পুনরায় গর্ভধারণের চেষ্টা করার আগে দম্পতিদের নিচের বিষয়গুলো বিবেচনা করা উচিত:

আগের চিকিৎসার নথিপত্র পর্যালোচনা: পূর্ববর্তী গর্ভাবস্থার যাবতীয় রিপোর্ট এবং চিকিৎসার ইতিহাস বিশেষজ্ঞ চিকিৎসককে দিয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে দেখানো।

দীর্ঘমেয়াদী রোগ নিয়ন্ত্রণ: ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ বা থাইরয়েডের মতো সমস্যা থাকলে তা গর্ভধারণের আগেই নিয়ন্ত্রণে আনা।

ফলিক অ্যাসিড সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ: চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত ফলিক অ্যাসিড গ্রহণ শুরু করা।

ওজন নিয়ন্ত্রণ: উচ্চতা অনুযায়ী শরীরের সঠিক ওজন (BMI) নিশ্চিত করা।

টিকাদানের অবস্থা যাচাই: প্রয়োজনীয় কোনো টিকা বাকি থাকলে তা গর্ভধারণের আগেই নিয়ে নেওয়া।

মানসিক স্বাস্থ্যের মূল্যায়ন: আগের কোনো তিক্ত অভিজ্ঞতার ট্রমা বা দুশ্চিন্তা দূর করতে মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন নেওয়া।

গর্ভধারণপূর্ব বিশেষজ্ঞ পরামর্শ বা কাউন্সিলিং প্রতিরোধযোগ্য ঝুঁকিগুলো উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দেয় এবং একটি সুস্থ গর্ভাবস্থার জন্য দম্পতিকে মানসিকভাবে প্রস্তুত হতে সাহায্য করে [২][৩]।

April 02 c.png 

এই যোগসূত্রগুলো প্রমাণ করে যে, গর্ভাবস্থা শরীরের সুপ্ত মেটাবলিক বা রক্তনালী সংক্রান্ত দুর্বলতার একটি আগাম সংকেত হিসেবে কাজ করতে পারে। তাই সন্তান প্রসবের পরবর্তী সময়ে যথাযথ ফলো-আপ, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং দীর্ঘমেয়াদী জীবনযাত্রার পরিবর্তন, যেমন-স্বাস্থ্যকর খাবার, নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম এবং সঠিক ওজন বজায় রাখা, মায়ের ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং দীর্ঘমেয়াদী রোগ প্রতিরোধের জন্য অত্যন্ত অপরিহার্য।

মনে রাখুন

পূর্ববর্তী গর্ভাবস্থার ফলাফলগুলো অত্যন্ত মূল্যবান ক্লিনিক্যাল তথ্য প্রদান করে, যা পরবর্তী গর্ভাবস্থার সঠিক যত্ন ও পরিকল্পনা গ্রহণে সাহায্য করে। যদিও অনেক নারী আগের জটিলতা কাটিয়ে পরবর্তী সময়ে সুস্থ সন্তানের জন্ম দেন, তবুও গর্ভপাত, অকাল প্রসব, উচ্চ রক্তচাপ, গর্ভকালীন ডায়াবেটিস, সিজারিয়ান ডেলিভারি বা মৃত সন্তান প্রসবের মতো ইতিহাস থাকলে বিশেষজ্ঞের মাধ্যমে সুনির্দিষ্ট মূল্যায়ন এবং আগাম ব্যবস্থাপনা গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি। ব্যক্তিগত পরামর্শ, গর্ভাবস্থার শুরু থেকে নিবিড় পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় মানসিক সহায়তার মাধ্যমে দম্পতিরা আত্মবিশ্বাসের সাথে এবং বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে পরবর্তী গর্ভাবস্থার প্রস্তুতি নিতে পারেন।

সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্নাবলি (FAQ)

আমার আগে একবার গর্ভপাত হয়েছে, আমার কি আবারও হওয়ার ঝুঁকি আছে?

একবার গর্ভপাত হলে পরবর্তী গর্ভাবস্থায় ঝুঁকির মাত্রা সামান্য বাড়তে পারে, তবে আশার কথা হলো—অধিকাংশ নারীই পরবর্তীতে একটি সুস্থ ও সফল গর্ভাবস্থা অতিবাহিত করেন এবং সুস্থ সন্তানের জন্ম দেন। আপনার পূর্ববর্তী গর্ভপাতের কারণ বিশ্লেষণ করে ডাক্তার কিছু বিশেষ পরীক্ষা বা নিবিড় পর্যবেক্ষণের পরামর্শ দিতে পারেন।

আগের গর্ভাবস্থায় আমার উচ্চ রক্তচাপ বা ডায়াবেটিস ছিল, এবারও কি তা হতে পারে? 

হ্যাঁ, আগের গর্ভাবস্থায় এসব সমস্যা থাকলে পরবর্তী সময়ে তা পুনরায় হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এই ঝুঁকি কমানোর জন্য গর্ভধারণের আগে থেকেই সঠিক ডায়েট চার্ট অনুসরণ করা, নিয়মিত চেক-আপ এবং গর্ভাবস্থার শুরু থেকেই নিবিড় পর্যবেক্ষণে থাকা অত্যন্ত জরুরি।

আমার আগে একবার অকাল প্রসব (Preterm birth) হয়েছিল, এবারও কি সময়ের আগেই বাচ্চা হবে? 

আগে অকাল প্রসবের ইতিহাস থাকলে পরবর্তী গর্ভাবস্থায় একই ঘটনার পুনরাবৃত্তির ঝুঁকি কিছুটা বেশি থাকে। তবে সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমে অনেক নারীই পূর্ণ মেয়াদে সন্তান প্রসব করতে সক্ষম হন। ঝুঁকি কমাতে আপনার চিকিৎসক আপনাকে বিশেষ পর্যবেক্ষণ, প্রয়োজনীয় ওষুধ বা জীবনযাত্রায় পরিবর্তনের পরামর্শ দিতে পারেন।

আমার আগের বাচ্চা সিজারে হয়েছে, এবার কি নরমাল ডেলিভারি সম্ভব? 

হ্যাঁ, নির্দিষ্ট কিছু শর্ত সাপেক্ষে আগের সিজারের পর নরমাল ডেলিবারি সম্ভব। এটি নির্ভর করে আপনার আগের সিজারের ক্ষত বা কাটাটি কেমন ছিল, কয়টি সিজার হয়েছিল এবং বর্তমানে আপনার ও শিশুর শারীরিক অবস্থা কেমন তার ওপর। তবে এটি অবশ্যই একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সরাসরি তত্ত্বাবধানে হতে হবে।

আগের গর্ভাবস্থার কোনো জটিলতা কি আমার ভবিষ্যতের স্থায়ী স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে? 

হ্যাঁ, গর্ভাবস্থার কিছু জটিলতা যেমন—প্রিক্ল্যাম্পসিয়া বা গর্ভকালীন ডায়াবেটিস ভবিষ্যতের দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্যঝুঁকির (যেমন: হৃদরোগ বা টাইপ-২ ডায়াবেটিস) আগাম সংকেত হতে পারে। তাই সন্তান প্রসবের পরেও নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন বজায় রাখা আপনার দীর্ঘমেয়াদী সুস্থতার জন্য অপরিহার্য।

তথ্য সুত্র need to know icon

1.     World Health Organization. WHO Recommendations on Maternal and Newborn Health. WHO. https://www.who.int/health-topics/maternal-health

2.     Centers for Disease Control and Prevention. Preconception Health and Health Care. CDC. https://www.cdc.gov/preconception/index.html

3.     American College of Obstetricians and Gynecologists. Prepregnancy Counseling. Committee Opinion No. 762. ACOG. https://www.acog.org/clinical/clinical-guidance/committee-opinion/articles/2019/01/prepregnancy-counseling

4.     Mayo Clinic. Pregnancy Complications. Mayo Clinic. https://www.mayoclinic.org/healthy-lifestyle/pregnancy-week-by-week/in-depth/pregnancy-complications/art-20047233

5.     American College of Obstetricians and Gynecologists. Early Pregnancy Loss. Practice Bulletin. ACOG. https://www.acog.org/womens-health/faqs/early-pregnancy-loss

6.     World Health Organization. Preterm Birth. WHO Fact Sheet. https://www.who.int/news-room/fact-sheets/detail/preterm-birth

7.     American College of Obstetricians and Gynecologists. Hypertension in Pregnancy. ACOG. https://www.acog.org/clinical/clinical-guidance/practice-bulletin/articles/2020/05/chronic-hypertension-in-pregnancy

8.     Centers for Disease Control and Prevention. Gestational Diabetes. CDC. https://www.cdc.gov/diabetes/basics/gestational.html

9.     National Health Service. Stillbirth and Pregnancy Loss Support. NHS. https://www.nhs.uk/pregnancy/support/when-pregnancy-ends/

10.  Cleveland Clinic. Postpartum Depression. Cleveland Clinic. https://my.clevelandclinic.org/health/diseases/9312-postpartum-depression