গর্ভকালীন ক্লান্তি দূর করার উপায়: বিনোদন ও বিশ্রাম
গর্ভাবস্থা প্রতিটি নারীর জীবনে একটি বিশেষ অধ্যায়। এই সময়টিতে একজন নারীকে নানা ধরনের শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়। এর মধ্যে অন্যতম হলো ক্লান্তি। গর্ভকালীন ক্লান্তি খুবই স্বাভাবিক একটি বিষয়, তবে এটি দৈনন্দিন জীবনকে প্রভাবিত করতে পারে। শারীরিক ও হরমোনের পরিবর্তনের জন্য গর্ভাবস্থায় অনেক সময় শক্তি কমে যায়। মানসিক চাপ, শরীরের নিজস্ব পরিবর্তন বা কোনো অসুবিধার কারণে এই ক্লান্তি বেড়ে যেতে পারে।১ সঠিক বিনোদন ও বিশ্রামের মাধ্যমে এই ক্লান্তি দূর করে গর্ভাবস্থাকে আরও আনন্দময় করা সম্ভব।
গর্ভকালীন ক্লান্তির কারণ
গর্ভাবস্থায় ক্লান্তি বিভিন্ন কারণে হতে পারে। নিচে কয়েকটি প্রধান কারণ আলোচনা করা হলো:
শারীরিক পরিবর্তন: এই সময়ে শরীরে বিভিন্ন হরমোনের (যেমন: ইস্ট্রোজেন ও প্রোজেস্টেরন) পরিবর্তনের কারণে ক্লান্তি বা দুর্বলতা অনুভব হতে পারে।২ এছাড়াও, শরীরের রক্ত সঞ্চালন বাড়ে, যা হৃদযন্ত্র এবং অন্যান্য অঙ্গের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে।
মানসিক চাপ: গর্ভাবস্থা একটি বড় পরিবর্তন, যা অনেক মানসিক চাপ নিয়ে আসতে পারে। ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা, প্রসবের ভয়, এবং মাতৃত্বের দায়িত্ব—এসব কারণে মানসিক চাপ বাড়তে পারে।
ঘুমের অভাব: গর্ভাবস্থায় অধিকাংশ নারীরই ঘুমের সমস্যা দেখা যায়।৩ গর্ভাবস্থায় শারীরিক অস্বস্তি, যেমন—বারবার প্রস্রাবের চাপ, কোমর ব্যথা, এবং শ্বাসকষ্টের কারণে রাতে ভালো ঘুম নাও হতে পারে। ঘুমের অভাব ক্লান্তি বাড়ায়।
পুষ্টির অভাব: গর্ভাবস্থায় শরীরে ভিটামিন এবং খনিজ পদার্থের চাহিদা বাড়ে। সঠিক খাবার না খেলে শরীরে পুষ্টির অভাব হতে পারে, যা ক্লান্তি বাড়াতে সাহায্য করে।
বিনোদনের মাধ্যমে ক্লান্তি দূর করার উপায়
বিনোদনের মাধ্যমে মানসিক ও শারীরিক ক্লান্তি দূর করা যায়। নিচে কয়েকটি বিনোদনমূলক উপায় আলোচনা করা হলো:
- প্রিয় সিনেমা দেখা বা গান শোনা: হালকা এবং মজার সিনেমা দেখলে মন ভালো হয়ে যায়। পছন্দের গান শুনলে মানসিক চাপ কমে এবং শান্তি পাওয়া যায়।
- বই পড়া: গল্পের বই বা উপন্যাস পড়লে অন্য জগতে হারিয়ে যাওয়া যায়, যা মনকে শান্তি দেয় এবং ক্লান্তি কমায়।
- হালকা ব্যায়াম বা যোগ ব্যায়াম: গর্ভাবস্থার জন্য উপযোগী হালকা ব্যায়াম এবং যোগাসন করলে শরীর সচল থাকে এবং ক্লান্তি দূর হয়। তবে, ব্যায়াম শুরু করার আগে অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে।
- সৃজনশীল কাজ করা: ছবি আঁকা, লেখালেখি, সেলাই করা বা অন্য কোনো সৃজনশীল কাজ করলে মন অন্যদিকে যায় এবং ভালো লাগে।
- বন্ধুদের সাথে গল্প করা: ভালো বন্ধুদের সাথে সময় কাটানো, গল্প করা এবং মনের কথা খুলে বললে মানসিক চাপ কমে এবং ক্লান্তি দূর হয়।
বিশ্রামের মাধ্যমে ক্লান্তি দূর করার উপায়
বিশ্রাম শরীরের জন্য খুবই জরুরি। নিচে কয়েকটি বিশ্রাম নেওয়ার উপায় আলোচনা করা হলো:
- পর্যাপ্ত ঘুম ও বিশ্রাম: নিয়মিত ও পর্যাপ্ত ঘুমানো অভ্যাস সারাদিন সতেজ থাকতে সহায়ক।৪ প্রতিদিন সাধারনত ৭-৯ ঘণ্টা ঘুমানো প্রয়োজন।৫ দুপুরে ৩০-৬০ মিনিটের জন্য বিশ্রাম নিলে শরীর সতেজ থাকে।
- সময়মতো খাবার খাওয়া: নিয়মিত স্বাস্থ্যকর খাবার খেলে শরীরের শক্তি বজায় থাকে এবং ক্লান্তি দূর হয়।
- কম্ফোর্টেবল পজিশনে বসা বা শোয়া: আরামদায়ক ভঙ্গিতে বসলে বা শুয়ে থাকলে শরীরের ক্লান্তি কমে। পায়ের নিচে বালিশ দিয়ে উঁচু করে রাখলে আরাম পাওয়া যায়।
- মেডিটেশন বা শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম: প্রতিদিন ১০-১৫ মিনিট মেডিটেশন করলে মন শান্ত হয় এবং ক্লান্তি দূর হয়। গভীর শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়ামও খুব উপকারী।
- কাজ থেকে বিরতি: একটানা কাজ না করে প্রতি ঘন্টায় ৫-১০ মিনিটের জন্য বিরতি নেওয়া উচিত।
জীবনযাত্রায় পরিবর্তন
কিছু জীবনযাত্রার পরিবর্তন এনেও ক্লান্তি কমানো যায়:
- কাজের চাপ কমানো: অফিসের কাজ এবং ঘরের কাজ কমিয়ে নিজের জন্য সময় বের করা উচিত।
- সহায়তা চাওয়া: গর্ভকালীন সময়ে ক্লান্তি মূলত শরীরের বিশ্রামের চাহিদা নির্দেশ করে। এ সময়ে সম্ভব হলে কাজকর্মে পরিবারের অন্য সদস্যদের সাহায্য নেওয়া উচিৎ। যেসব কাজ করতে গিয়ে বেশি কষ্ট হয়, সেখানে তাদের সহায়তা চাওয়া উচিত।৬ পরিবার এবং বন্ধুদের কাছ থেকে সাহায্য নিতে দ্বিধা করা উচিত নয়।
- স্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণ: প্রচুর ফল, সবজি, এবং প্রোটিন খাবারের তালিকায় যোগ করা উচিত। ফাস্ট ফুড ও চিনি যুক্ত খাবার এড়িয়ে যাওয়া ভালো।
- নিয়মিত হাঁটাচলা: হালকা হাঁটাচলা শরীরকে সচল রাখে এবং ক্লান্তি কমায়।
করণীয় ও বর্জনীয়
ক্লান্তি দূর করার জন্য কিছু জিনিস করা উচিত এবং কিছু জিনিস এড়িয়ে যাওয়া উচিত:
- করণীয়:
- পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেওয়া।
- হালকা ব্যায়াম করা।
- পুষ্টিকর খাবার খাওয়া।
- ক্যাফেইন এড়িয়ে চলা।
- প্রিয় কাজগুলো করা।
- দৈনিক ২-৩ লিটার পানি পান করা।৭
- বর্জনীয়:
- অতিরিক্ত পরিশ্রম করা।
- মানসিক চাপ নেওয়া।
- অস্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া।
- দীর্ঘ সময় ধরে বসে থাকা বা দাঁড়িয়ে থাকা।
উপসংহার
গর্ভকালীন ক্লান্তি একটি স্বাভাবিক সমস্যা, তবে সঠিক বিনোদন ও বিশ্রাম এবং জীবনযাত্রায় কিছু পরিবর্তন আনার মাধ্যমে এটি মোকাবেলা করা সম্ভব। নিজের শরীরের প্রতি যত্ন নেওয়া, ডাক্তারের পরামর্শ মেনে চলা এবং ইতিবাচক থাকা—একটি সুস্থ ও সুন্দর গর্ভাবস্থার জন্য খুবই জরুরি।
তথ্য সুত্র
- Bossuah KA. Fatigue in pregnancy. Int J Childbirth Educ. 2017;32(1):10–10. (Google Scholar )
- Bialobok, Kristin M., and Manju Monga. “Fatigue and Work in Pregnancy.” Current Opinion in Obstetrics and Gynecology, vol. 12, no. 6, Dec. 2000, pp. 497–500.
- Reichner, Cristina A. “Insomnia and Sleep Deficiency in Pregnancy.” Obstetric Medicine, vol. 8, no. 4, Sept. 2015, pp. 168–71.
- Tsai, Shao-Yu, et al. “Daily Sleep and Fatigue Characteristics in Nulliparous Women during the Third Trimester of Pregnancy.” Sleep, vol. 35, no. 2, Feb. 2012, pp. 257–62.
- Hirshkowitz, Max, et al. “National Sleep Foundation’s Sleep Time Duration Recommendations: Methodology and Results Summary.” Sleep Health, vol. 1, no. 1, Mar. 2015, pp. 40–43.
- Bialobok, Kristin M., and Manju Monga. “Fatigue and Work in Pregnancy.” Current Opinion in Obstetrics and Gynecology, vol. 12, no. 6, Dec. 2000, pp. 497–500.
- “How Much Water Should I Drink during Pregnancy?” ACOG, https://www.acog.org/womens-health/experts-and-stories/ask-acog/how-much-water-should-i-drink-during-pregnancy. Accessed 17 Aug. 2022.